ওপারে বন্ধুর সঙ্গে দেখা হবে হয়ত

সত্তর ও আশির দশকের জনপ্রিয় রাজ্জাক-কবরীর জুটি যে মানুষ সহসা ভুলবে না সেটা তামা'র পাতায় লিখে দেওয়া যেতে পারে। তখনকার সময়ে পর্দায় এই জুটির প্রেমময় সংলাপের মুগ্ধ হয়ে কত প্রেমিক যুগল আন্দোলিত হয়েছেন; তা গু'নে শেষ করা যাবে না। তাই তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাজ্জক-কবরী জুটির আবেদন একটুও কমেনি।

এই জুটি পর্দায় এতটা সাবলীল ছিলেন যে, মানুষ ধরেই নিয়েছিলেন রিল লাইফের মতো রিয়েল লাইফেও চুটিয়ে প্রেম করছেন তারা। যদিও রাজ্জাক-কবরী সেসব গু'ঞ্জন গায়ে মাখেননি কখনও। নিজের ৭৬তম জন্ম'দিনের প্রারম্ভে ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গু'লশানে নিজের বাসভবন ‘রাজলক্ষী’তে বসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের ছলে কবরীর সঙ্গে ‘প্রেমকথা’ নিয়ে মুখ খুলেছিলেন নায়করাজ।

তখন তিনি বলেছিলেন, ১৯৬৮ সালে সুভাষ দত্ত আমাকে আর কবরীকে নিয়ে নির্মাণ করলেন ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্র। প্রথম ছবি দিয়েই বাজিমাত হয়ে গেল। দর্শকের মনে লেগে গেল আমা'দের জুটি। তারপর অ'সংখ্য ছবিতে কাজ করেছি। যেখানেই যেতাম সবখানেই রাজ্জাক-কবরী এক নাম। তোমা'দের মা-খালাদের কাছে প্রশ্ন করো’ যে রাজ্জাক-কবরী সম্পর্কে কিছু বলো। তারা দেখবে ফিসফিস করে বলছে, ওহ বাবা! সে কী প্রেম। আসলে আমা'র আর কবরীর পর্দার প্রেমটাকে সবাই এতটাই ভালোবেসেছিলেন যে এটাকে তারা বাস্তব মনে করতেন। সবাই আমা'দের প্রেমের স্টাইল ফলো করতেন, আমা'দের সংলাপ ব্যবহার করতেন, আমা'দের গানগু'লো গাইতেন।

এদিকে প্রেমিক নয়, রাজ্জাক তার ভালো বন্ধু ছিল বলেই মনে করতেন কবরী। নিজেদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক কবরী গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, আমা'দের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে ‘ময়নামতি’ সিনেমায় কাজ করতে গিয়ে। অ'ভিনয় করতে গিয়ে বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। একে অ’পরের কাছ থেকে শিখেছি। আমর'া নিজেদের মধ্য ভাবের আ'দান-প্রদান করেছি। বিভিন্ন বি'ষয়ে কথাবার্তা এক্সচেঞ্জ করেছি। সিনেমা'র চরিত্র নিয়ে কথা বলেছি। এ রকম কাজ করতে গিয়ে আমা'দের বন্ধুত্ব হয়েছে। বি'ষয়টি এমন না যে উনার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমা'র প্রেম হয়ে গেল, জুটি হয়ে গেল কিংবা বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এটা মোটেও তেমন নয়।

কবরী আরও বলেছিলেন, আমা'দের দিনের একটা বিরাট সময় ধরে একসঙ্গে শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। প্রেমিক জুটি হয়ে পর্দায় গল্প উপস্থাপন করতে গিয়ে নিজেদের ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠা মোটেও অ'স্বাভা'বিক নয়। আমি তো এমনও মনে করি, আমর'া শুধু জুটি হিসেবে সফল হয়েছি তা কিন্তু নয়, অ'ভিনয়শিল্পী হিসেবেও একটা সাক্ষরতা রেখে যেতে পারছি। এটাই আমা'র সবচেয়ে বেশি আনন্দ।

তবে রাজ্জাকের সঙ্গে প্রেমের গু'ঞ্জন নিয়ে মাঝে মাঝে বির'ক্ত 'হতেন কবরী। এ প্রসঙ্গে রাজ্জাক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, একবার কবরীর সঙ্গে দেখা 'হতেই সে কী রাগ। বললাম ব্যাপার কী? তিনি বললেন, ‘রাজ্জাক ভাই কোথাও যেতে পারি না। সবাই দেখলেই বলে ওই যে রাজ্জাক-কবরী যায়। আচ্ছা, আমা'র নাম তো শুধু কবরী। সবাই আগে রাজ্জাক বসায় কেন!’ আমি হাসতে হাসতে জবাব দিলাম, ‘দে খু'ন সবাই আপনাকে মিসেস রাজ্জাক বলতে পছন্দ করে। এটা জুটির সাফল্য।’ আমা'র কথা শুনে কবরী তো আরও রেগে গেলেন।

প্রেমের গু'ঞ্জন ছাপিয়ে কবরী মনে করতেন, রাজ্জাক-কবরীর মতো জুটি আর হবে কিনা বলা কঠিন। রাজ্জাকের মৃ'ত্যুর পর গণমাধ্যমের এক সাক্ষাৎকারে কবরী বলেছিলেন, রাজ্জাক সাহেব আর আমি অনেকদিন একসঙ্গে কাজ করেছি। দীর্ঘদিনের সহকর্মী আমর'া। কাজেই এমন একজন প্রিয় সহকর্মীকে হারানোর ক'ষ্ট আছে, সেটা থাকবেই। সবচেয়ে বড় কথা একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমা'দের দুজনের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব হয়েছিল। সেই বন্ধুত্ব সব সময়ই ছিল। এদিক থেকে বলব, ভালো একজন বন্ধুকে হারিয়েছি। নায়ক নয়-বন্ধুত্বটাও কম বড় নয়।

তিনি আরও বলেছিলেন, লোকে বলত রাজ্জাক-কবরীর বিয়ে হলে ভালো 'হত। যেমনটা বলত উওম সুচিত্রার বেলায়। এসব ছিল মানুষের ভালোবাসার প্রকাশ। সেখানে আমা'দের করার কিছু ছিল না। কিন্তু রাজ্জাক এবং আমি দুজনেই বিবাহিত ছিলাম। তবুও লোকে বলত। কেন বলত? পর্দার জুটি হিসেবে সফলতা পেয়েছিলাম বলেই বলত। আমা'দের দুজনার কেমিস্ট্রি দর্শক গ্রহণ করেছিলেন। ভালো কেমিস্ট্রি গড়ে উঠেছিল আমা'দের। অনেক হিট সিনেমা আছে দুজনের। যার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল ছিল না। জুটি প্রথা আর জনপ্রিয়তায় আমর'া অনেক শীর্ষে পৌঁছেছিলাম। রাজ্জাক-কবরীর মতো জুটি আর হবে কিনা বলা কঠিন।

কবরীর ভাষ্য, আমর'া জুটি হিসেবে মানুষের এতো ভালোবাসা পেয়েছিলাম, যা সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। ভাগ্য আমা'দের সহায় ছিল। এছাড়া, আমর'া পরিশ্রমও করেছিলাম খুব। কাজের প্রতি সততা ও ভালোবাসা ছিল ভীষণ রকমের। আমর'া মানুষকে ভালোবেসেছি, মানুষ আমা'দের ভালোবাসা দিয়েছে।

রাজ্জাকও ভাবতেন কবরীর মতো করে। তাই জীবদ্দশায় বলেছিলেন, কত মুখরোচক গল্প ছড়িয়েছে আমা'দের দুজনকে নিয়ে। কত পত্রিকায় কত গল্প-উপন্যাস। মাঝে মাঝে মন খারাপ করতাম। কবরীও অনেক আপসেট হয়ে যেত। কিন্তু জহির রায়হান সাহেবের একটা কথা আমি সবসময় মনে রেখেছি। সেটি হলো, ‘যতদিন তোমাকে নিয়ে কাগজে গাল-গল্প লেখা আসবে ততোদিন তুমি সুপারস্টার। যেদিন আর কেউ তোমাকে নিয়ে কৌতুহলী হবে না সেদিন তুমি কেউ নয়।’ তার এই কথাটা ভেবে আমি আর মন খারাপ করিনি কখনও।

রাজ্জাক মা'রা যাওয়ার পর খুব ব্যথিত হয়েছিলেন কবরী। তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই প্রিয় সহকর্মী হারানোর ব্যথা বুকে নিয়ে ওপারে পাড়ি জমালেন কবরী। দুজনেই এখন এক ভুবনের বাসিন্দা দুজন। ওপারে হয়ত তাদের দেখা হবে। চোখে চোখ রাখবেন। কথা হবে। হাতে হাত রেখে পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখবেন, প্রিয় জুটি হারানোর শোকে মুহ্যমান মানুষের হৃদয় বিদারক হাহাকার।

Facebook Comments
Back to top button