সিমেন্টের বস্তায় তৈরি ঝুপড়িতে দিন কা’টছে মতি-রাশিদার

ঘর নেই, তাই সিমেন্টের বস্তা, পলিথিন আর বাঁশের তৈরি ছাপড়ার নিচে দুই বছর ধরে থাকছেন এক দম্পতি। অ’সহায় মতি ব্যাপারী (৩০) ও রাশিদা বেগম (২৫) দম্পতির ঝুপড়ির নিচে দুই বছর পার হলেও তাদের ভাগ্যে আজও জোটেনি সরকারি কোনো সাহায্য বা ঘর।

দুই শতাংশ জমির আর সিমেন্টের বস্তা ও পলিথিন ঘেরা ঝুপড়িটিই তাদের একমাত্র সম্বল। এই দম্পতির সংসারে আছে এক ছেলে রবিউল ব্যাপারী (৭) ও এক মেয়ে মর'’িয়ম (৩)। খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটছে অভাগা মতি-রাশিদা দম্পতির। তাদের বাড়ি শরীয়তপুর সদর উপজে’লার রুদ্রকর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর চন্দনকর গ্রামে।

কথা হয় অ’সহায় মতি ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে জানান, ২২ বছর বাবা-মা’র সঙ্গেই ছিলেন তিনি। তার বাবার নাম কাবিল ব্যাপারী। মা মাসুদা বেগম। তারা সাত ভাই, দুই বোন। তিনি ভাই বোনদের মধ্যে পঞ্চম।

২০১৪ সালে তিনি একই ইউনিয়নের সুবচনী চরমালগাঁও গ্রামে বিয়ে করেন। নিজের পরিবার অ’সচ্ছল হওয়ায় বিয়ের পর নিজ বাড়িতে যায়গা হয়নি। তাই বিয়ের পর পরিবার নিয়ে দুই বছর শ্বশুর বাড়িতে থেকেছেন তিনি। পরে সেখানে যায়গা না হওয়ায় ভেদরগঞ্জ উপজে’লার ছয়গাঁও এলাকার মঙ্গল খাঁর বাড়িতে থাকতেন। এর মাঝেই জন্ম হয় ছেলে রবিউল ও মেয়ে মর'’িয়মের। ওই বাড়িতে চার বছর থাকার পর বাড়িওয়ালা বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেন। কোথাও থাকার জায়গা না পেয়ে পরিবার নিয়ে আবার বাপ-দাদার ভিটেয় এসে ওঠেন মতি ব্যাপারী।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মতি ব্যাপারীর অ’সহায়ত্বের কথা জানতে পারেন শরীয়তপুরের জে’লা প্রশাসক পারভেজ হাসান। পরে শরীয়তপুর সদর উপজে’লা নির্বাহী কর্মক’র্তা (ইউএনও) মনদীপ ঘরাইকে খোঁজ নিতে বলেন। বৃহস্পতিবার (২২ এপ্রিল) সকালে ইউএনও মতি ব্যাপারীর বাড়িতে যান। তার পরিবারের খোঁজ-খবর নেন।

মতি ব্যাপারী জাগো নিউজকে বলেন, আমি মাটি কা’টা শ্রমিক। বিয়ের আগে বাবার ঘরে ছিলাম। বিয়ের পর থাকার যায়গা না থাকায় অন্যের বাড়ি বাড়ি ছিলাম। আমি গরিব, টাকার অভাবে ঘর তুলতে পারিনি। বাবার কাছ থেকে দুই শতাংশ জমি পেয়েছি। সেখানেই সিমেন্টের বস্তা, পলিথিন আর বাঁশে ঘেরা ছাপড়ার নিচে দুই বছর ধরে আছি। ঝড় তুফান হলে আমা’র ঘরটি উড়ে যাব’ে।

তিনি বলেন, ইউএনও স্যার আমা’দের খোঁজ-খবর নিতে এসেছিলেন। সরকারের পক্ষ থেকে আমাকে যদি একটি ঘর দিতো তাহলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখে দিন কা’টাতে পারতাম।

তিনি আরও বলেন, আমা’র বাবা কৃষক। তাই আমা’দের পড়াশোনা করাতে পারেনি। আমি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। অভাবের সংসার, অভাবেই কাটছে।

বৃহস্পতিবার ‘'বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, সিমেন্টের বস্তা, পলিথিন আর বাঁশ দিয়ে ঝুপড়ি তুলেছেন মতি ব্যাপারী। ছাপড়ার ভেতরে ছোট একটি বৈদ্যুতিক ফ্যা'’ন ঘুরছে। পাশেই মশারি, পুরোনো দুটি বালিশ। নিচে হোগলা পাতার বিছানা, তাও ছেঁড়া। ছাপড়ার পূর্ব পাশে খোলা রান্না ঘর। পাশেই অন্যের একটি পুকুর। নেই কোনো টিউবওয়েল।

মতির স্ত্রী রাশিদা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাগো নিউজকে বলেন, সন্তানদের নিয়ে অনেক ক’'ষ্টে থাকি। এমন ঘরে থাকা যায় না। ঝর বৃ’'ষ্টি হলে কোন দিকে যাব’ দিশা পাই না।

মতির বৃ’'দ্ধা মা মাসুদা জাগো নিউজকে বলেন, আমর'’া গরিব। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিক্ষা দিতে পারি নাই। আমা’র ছেলে মতির ঘর নাই। কাগজ দিয়া ঘর উঠাইয়া থাকে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতে অনেক ক’'ষ্ট হয়। একটি ঘর খুবই দরকার।

ওই গ্রামের বাসি’ন্দা খালেক ব্যাপারী, হারুন ব্যাপারীসহ অনেকেই বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভূমিহীন ও দুস্থ অ’সহায়দের বাড়ি করে দিলেও তাদের ভাগ্যে ঘর জোটেনি। কেউ খোঁজ নেয় না তাদের। সরকারের পক্ষ থেকে মতিকে যদি একটি ঘর দিতো তাহলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতে পারতো।

রুদ্রকর ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মজিবর রহমান খোকন বলেন, আমা’র কাছে মতির পরিবার কখনো আসেনি। আমি তার পরিবারকে ভিজিএফ কার্ডের ব্যবস্থা করে দেবো। যতটা সম্ভব সহযোগিতা করবো।

সদর উপজে’লা নির্বাহী কর্মক’র্তা (ইউএনও) মনদীপ ঘরাই বলেন, সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে জে’লা প্রশাসক স্যার ওই অ’সহায় পরিবারটির ব্যাপারে জানতে পারেন। তখন আমাকে খবর নিতে বলেন। বৃহস্পতিবার সকালে পরিবারটির পাশে গিয়ে যা দেখলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘর আমর'’া যাদের দিচ্ছি, এই পরিবারের চেয়ে ভালো সিলেকশন আর ‘'হতে পারে না। পরিবারটি পলিথিন মোড়ানো যায়গায় থাকছে। আমি তাদের এতটুকু আশ্বা’স দেয়ার চে’'ষ্টা করেছি, আগামী এক মাসের মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যে উপহার আছে, অর্থাৎ ঘর, সেই ঘরে আপনারা উঠতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, আপাতত সংসদ সদস্যর সঙ্গে পরামর'’্শক্রমে টিন দিয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। কারণ, সামনে বৃ’'ষ্টি ও কাল বৈশাখী ঝড়। তখন এই পরিবারের কী অবস্থা হবে। ইতোমধ্যে তাদের যে যায়গাতে ঘর দেয়া হবে, সেই যায়গার মাটির কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। দুই-একদিনের মধ্যে ঘরের কাজ শুরু করা যাব’ে আশা করা যাচ্ছে।

Facebook Comments
Back to top button