স্ত্রী’কে ধোঁ’কা দিয়ে ঝর্ণাকে যৌ’নদাসী হিসেবে ব্যবহার করছেন মামুনুল হকঃ তসলিমা নাসরিন

বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হন ২০০৪ সালে। এরপর তিনি আশ্রয় নেন ভা’রতে। সেখানে থেকেও আলোচনা-সমালোচনার তুঙ্গে রয়েছেন তিনি। সম্প্রতি হেফাজত নেতা মামুনুল হককে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টে ঘটে যাওয়া আ’লোচিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন এই লেখিকা।

পাঠকদের জন্য তসলিমা নাসরিনের স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধ’রা হলো-

নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টে হেফাজতি নেতা মামুনুল হক নিজে যে আদর্শের কথা ওয়াজে মাহফিলে শোনান, সেই আদর্শের বাইরে কাজ করতে গিয়ে ধ’রা পড়লেন কিছু তরুণের হাতে এবং আল্লাহর কসম খেয়ে ডাহা মি’থ্যে কথা বলতে লাগলেন- এই খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ পাওয়ার পর শত শত মা'দ্রাসার ছে’লে তাদের গু'রু মামুনুল হককে উ’'দ্ধার করতে গিয়ে রিসোর্টের ভেতর রিসেপশান, রেস্তোরাঁ যা পেয়েছে ভেঙ্গে গু'ঁড়ো করে দিয়েছে। দেখে প্রশ্ন জাগছিল মনে, মা'দ্রাসার ছে’লেরা এভাবে অন্যের সম্পত্তি ধ্বং'স করার কায়দা কোত্থেকে শিখেছে? হাতে ওদের এমন সব শক্ত লা’ঠি কে দিল? এমন সব অ’স্ত্র, যেগু'লো দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোটা রিসোর্টের যাবতীয় জিনিসপত্র মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়!

যারা রিসোর্টে ধ্বং'সাত্মক কাজ করেছে, যারা মামুনুল হককে মা’থায় তুলে সম্মান দিয়েছে, তারা কি জানেনা মামুনুল হক সেই কাজটিই করেছেন যে কাজটিকে তিনি নিজেই অ’নৈতিক, অ’বৈধ, অন্যায় বলেন? তারা কি জানে না, আল্লাহর কসম কে’টে তাদের গু'রু মি’থ্যে কথা বলেছেন? তারা সব জানে, কিন্তু এতে তাদের কিছু যায় আসে না। তারা শিখেছে গু'রু যত ভুলই করুন, গু'রু যত মি’থ্যেই বলুন, যত প্রতারণাই করুন, গু'রুকে গু'রু বলে মানতে হবে। গু'রুকে অন্ধভাবে বিশ্বা’স করতে হবে। গু'রু ১০০ খু’ন করে এলেও গু'রু নি’র্দোষ। বলাই বাহুল্য, যু’ক্তিবু'দ্ধিহীন অন্ধ বধির এক জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। এই জনগোষ্ঠী তৈরির কারিগর মামুনুল হক এবং তার মৌলবাদী সহিং’স সতীর্থরা।

প্রথমে ভেবেছিলাম মামুনুল হক তাঁর প্রে’মিকা নিয়ে প্রমোদ বিহারে গেছেন, যেতেই পারেন, প্রে’ম করা অন্যায় নয়। পরে কিছু ফোনালাপ থেকে বোঝা গেল প্রে’ম নয়, দুজন মহিলার সঙ্গে তিনি প্রতারণা করছেন। নিজের স্ত্রীকে দিনের পর দিন ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছেন, আর ওদিকে জান্নাত আরা ঝর্ণাকে, যাকে তিনি আল্লাহর কসম কে’টে বলেছেন বিয়ে করেছেন, আসলে যাকে তিনি বিয়ে করেননি, নেহাত যৌ'’নদাসী হিসেবে ব্যবহার করছে্ন। এত ভ’য়ংকর নারীবিদ্বেষী লোক নারীর সঙ্গে প্রে’ম করেন না, নারীকে নিজের বীর্য ফেলার ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করেন। দুই রমণীই কিন্তু তাঁকে আপনি সম্বোধন করেন। দু’জনই তাঁকে প্রভু মানেন। প্রে’ম-ভালোবাসার স’ম্পর্ক কখনও প্রভু-দাসীর স’ম্পর্ক নয়।

ঝর্ণার সঙ্গে কোনও এক ভাইয়ার ফোনালাপ থেকে আম’রা জানতে পারি তিনি এবং মামুনুল হক স্বামী স্ত্রীর মতো বাস করেন বটে, তবে তাঁদের বিয়ের কোনও কাবিননামা হয়নি, রেজিস্ট্রেশনও হয়নি- ঝর্ণা নিজেই বলেছেন এ কথা। কাবিননামা হয়নি এবং রেজিস্ট্রেশন হয়নি মানে বিয়ে হয়নি। ঝর্ণা কিন্তু বিয়ে হবে বলে বসে আছেন এবং মামুনুল হক তাঁকে ভোগ করে যাচ্ছেন বিয়ে করবেন এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এই কাজটি কারা' করে বলে আম’রা জানি? তাদের তো প্রতারণার দায়ে জে’ল খাটতে হয়। সরকারি প্রশ্রয় পাচ্ছেন বলে মামুনুল হককে জে’ল খাটতে হচ্ছে না। মামুনুল হক বাংলাদেশের আইনে বিশ্বা’স না করলেও শরিয়া আইনে বেশ বিশ্বা’স করেন। তাঁকে যদি ব্যাভিচারের শা’স্তি শরিয়া আইনে দেওয়া হয় তাহলে সেই শা’স্তি তিনি সহ্য করতে পারবেন তো? সেটি কিন্তু পাথর ছুঁড়ে হ’'ত্যা। মামুনুল হকের ভাগ্য ভালো যে তিনি যে দেশে বাস করেন, সে দেশে শরিয়া আইন নেই, যে আইন আনার জন্য তিনি দিনভর চি’ৎকার করেন এবং ভক্তবৃন্দকে উত্তেজিত করেন।

হেফাজতি নেতাদের মধ্যে মামুনুলের কী’র্তি নিয়ে ফোনালাপ, স্ত্রীকে মি’থ্যে বলা শিখিয়ে দেওয়ার জন্য মামুনুলের ফোনালাপ, মামুনুলের স্ত্রীকে মামুনুলের দ্বিতীয় বিয়ে স’ম্পর্কে মি’থ্যে বলার জন্য অনুরোধ করে মামুনুলের বোনের ফোনালাপ, ঝর্ণার সঙ্গে মামুনুলের বি’রু'দ্ধে ক্ষি'প্ত ঝর্ণার পুত্রের ফোনালাপ, ঝর্ণার সঙ্গে কাবিননামা এবং রেজিস্ট্রেশন না হওয়া বি'ষয়ে এক ভাইয়ার ফোনালাপ, মামুনুলের সঙ্গে তৃতীয় মহিলার ঘনিষ্ঠ ফোনালাপ, মামুনুলের প্রতারণা স’ম্পর্কে ঝর্ণার পুত্রের ভিডিও। এগু'লো শুনলেই প্রতারক মামুনুলের চরিত্র উন্মোচিত হয়। মাত্র দুটি প্রতারণার কাহিনী বেরোলো। এরকম কত কাহিনী আছে, কে জানে।

নারী নি’র্যাতন, নারী হে'নস্থা, নারীর সঙ্গে প্রতারণা বাংলাদেশের বদ পু’রুষলোকেরা অহরহই করে। মামুনুল যেহেতু নেতা, যেহেতু তার আদেশে লক্ষ পঙ্গপাল চারদিক পু'ড়িয়ে ছাই করে দেয়, নিজেরা শুধু খু’ন করতে নেমে পড়ে না, নিজেরা খু’ন 'হতেও নেমে পড়ে, সেহেতু মামুনুলের চরিত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণ জরুরি। পঙ্গপালগু'লোর জানা জরুরি কোন নিকৃ'ষ্ট লোকের, কোন প্রতারকের, মিথ্যুকের, কোন স্বার্থান্ধ বদ-লোকের আদেশ তারা মেনে চলে। হয়তো যারা অন্ধ ভক্ত, তাদের কোনও বোধোদয় হবে না। কিন্তু যারা এখনও অন্ধ হয়নি, তাদের তো পরিবর্তন 'হতে পারে।

মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা তো অ’প’রাধ, মামুনুল তো সেই অ’প’রাধ করছেনই, সবচেয়ে বড় অ’প’রাধ তিনি করছেন, তাঁর ওয়াজে তিনি প্রগতির বি’রু'দ্ধে, মুক্তচিন্তার বি’রু'দ্ধে, নারীর বি’রু'দ্ধে, সংখ্যালঘুদের বি’রু'দ্ধে ভ’য়াবহ বি'ষ উগরে দিচ্ছেন, সেই বি'ষের ক্রিয়ায় শত শত শিশু কি’শোর যুবক হিং'স্র দাঙ্গাবাজ হয়ে উঠছে। যুবসমাজকে তিনি স'ন্ত্রাসবাদে আর জ’ঙ্গিবাদে দীক্ষিত করছেন- এটি নিশ্চিতই তাঁর অক্ষ'মাযোগ্য অ’প’রাধ। এইতো সেদিন তিনি মা'দ্রাসার ছাত্রদের লেলিয়ে দিয়েছেন সারাদেশ জুড়ে স'ন্ত্রাস করার জন্য। স'ন্ত্রাস করেছে তারা, দেশের অমূল্য সব সম্পদ পু'ড়িয়ে দিয়েছে, শুধু তাই নয়, নিজেরাও ম’রেছে। জেনে বুঝে দেশ ও মানুষের সর্বনাশ করা খুব বড় অ’প’রাধ। এই অ’প’রাধের কারণে মামুনুল হকের শা’স্তি হওয়া অ’ত্যন্ত জরুরি। তাঁর কারণে মৃ'’ত্যু হলো ভক্তকুলের, কোথায় তিনি নিজেকে তাঁদের মৃ'’ত্যুর জন্য দায়ী করে গ্লানি বোধ করবেন, কোথায় তিনি কাঁদবেন, হাহাকার করবেন, তিনি চলে গেলেন আনন্দ করতে। তারপরও কি ভক্তকুল তাঁর আচরণে ক্ষু'ব্ধ হবে না? গু'রুর চরণামৃ'’ত খেয়ে গু'ণগান গাওয়া ছাড়া আর কিছু ভক্তকুলের মগজে ঢোকানো হয়নি।

তবে মামুনুলকে নিয়ে হেফাজতি অন্য নেতাদের মধ্যে কিছু অ'সন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁরা যদি কখনও মামুনুলকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষ'ম হন, তাহলে কি এই সংগঠনকে কোনও সভ্য সংগঠন হিসেবে দাঁড় করানো সম্ভব হবে? আমা’র তো মনে হয় না। মামুনুলের মতো প্রতারক যদি নাও হন , হেফাজতি নেতারা কিন্তু স'ন্ত্রাসবাদে বিশ্বা’স করেন, এ কথা সত্য। এ পর্যন্ত হেফাজতের নেতারা মা'দ্রাসার শিশু কি’শোরদের দিয়ে দেশ জুড়ে স'ন্ত্রাস ঘটানোর জন্য ক্ষ'মা চান নি, দুঃখ প্রকাশও করেননি। তবে কী’ কারণে মামুনুল হককেই একা মন্দ বলে মনে করছি? ভা’রতের দেওব’ন্দিরা কোনও দাঙ্গা ফ্যা'সাদ ভায়োলেন্সে যায় না। কিন্তু দেওব’ন্দি আদর্শ মেনে চলা বাংলাদেশের হেফাজতে ইস’লাম, আ’ফগা’নিস্তানের তালিবান, পা’কি'স্তানের লস্করে ঝাংভি, সিপাহে সাহাবা, তেহরিকে তালিবান দিব্যি স'ন্ত্রাস করে বেড়াচ্ছে। পা’কি'স্তানে সিপাহে সাহাবা সংগঠনটি নি'ষি'দ্ধ হয়েছে। বাকি সব স’ন্ত্রাসী সংগঠনই নি'ষি'দ্ধ হওয়া উচিত।

রাজনৈতিক ইস’লাম খুব বিপজ্জনক। রাজনৈতিক ইস’লামের নেতারা দেশে শরিয়া আইন চালু করতে চান, যে আইনে মেয়েদের কোনও অধিকার থাকবে না। যাঁরা আল্লাহর কসম কে’টে মি’থ্যে কথা বলেন, তাঁরা কোনও ভুল নয় যে, আল্লাহর অ'স্তিত্বে বিশ্বা’স করেন না। আল্লাহ রসুলকে তাঁরা নিজেদের স্বার্থ সি'দ্ধির জন্য ব্যবহার করেন মাত্র। শরিয়া আইন চালু করতে চান তাঁদের নারীবিদ্বেষ আর অমু’সলিম বিদ্বেষের জন্য। কোনও নারী যেন অধিকার বা স্বাধীনতা বলতে কিছু না পায়, কোনও অমু’সলিমেরও যেন এ অঞ্চলে বাস করতে না পারে।

যারা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ন'ষ্ট করেছে, তাদের গ্রে'’ফতার করা হয়েছে। কিন্তু যারা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সঙ্গীত একাডেমী পু'ড়িয়ে দিয়েছে, যারা লাইব্রেরি পু'ড়িয়েছে, যারা জনগণের সম্পদ বাস ট্রাক জ্বা'লিয়ে দিয়েছে, যারা মন্দির ভেঙ্গেছে তাদের কেন গ্রে'’ফতার করা হচ্ছে না? নাকি এই স'ন্ত্রাসবাদীদের সকল স'ন্ত্রাস ক্ষ'মাসুন্দর দৃ'ষ্টিতে দেখা হচ্ছে? জানি সরকারি দলের অনেকে মনে করেন, সত্যিকার রাজনৈতিক দল থাকার চেয়ে প্রতিপক্ষ হিসেবে ইস’লামী মৌলবাদী স’ন্ত্রাসীরাই থাকা ভালো। এতে বিপদ দেখলে এদের দান দক্ষিণা দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, বাইরের বিশ্বের কাছ থেকে সহানুভূ'ত িও জুটবে, মৌলবাদের মোকাবেলা করার জন্য।

আধুনিকতাও চাই, মৌলবাদও চাই, এ হয় না। সংস্কৃতিও চাই, অ’পসংস্কৃতিও চাই, এ হয় না। শান্তি চাই, স'ন্ত্রাসও চাই, এ হয় না। দুই নৌকোয় পা দিয়ে চললে ডুবে ম’রতে হয়, এই সত্য কি ডুবে না ম’রা পর্যন্ত বিশ্বা’স হবে না?

Facebook Comments
Back to top button