ঈশ্বর আমাকে সব দিয়েছে, শুধু পয়সা দেয়নি: এটিএম শামসুজ্জামান

বাংলা চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে ‘জীবন্ত কিংবদন্তি’ বলা হয় তাকে। গ্রামের মন্দ মোড়লের চরিত্রে তার অনবদ্য অ'ভিনয় আজও বহু দর্শকের চোখে ভাসে। দীর্ঘ অ'ভিনয় জীবনে বিভিন্ন চরিত্রে অ'ভিনয় করেছেন। হয়েছেন প্রশংসীত। পেয়েছেন অ'সংখ্য পুরস্কার। খল চরিত্রে কমেডি অ'ভিনয়ের মাধ্যমে তৈরি করেছেন নতুন এক ধা'রা। টেলিভিশনের পর্দাতেও তিনি সফল।

অ'সুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন অ'ভিনয় থেকে দূরে থাকলেও এটিএম শামসুজ্জামান আজও দর্শকের কাছে প্র'ত্যাশিত এক নাম। প্রবীণ এই অ'ভিনেতার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাহাত সাইফুল।

রাহাত সাইফুল : আপনার ছেলেবেলার ঈদের কথা মনে পড়ে? কেমন কে'টেছে সেই দিনগু'লো?
এটিএম শামসুজ্জামান : ছোটবেলা আব্বা ঈদের সালামি দিতেন। তখন একআনা পেলেই মহাখুশি! আব্বার সঙ্গে গরুর হাটে যেতাম। গরু নিয়ে অনেক মজার ঘটনা আছে। একবার হাটের সবচেয়ে বড় গরু কিনে বাড়ি ফিরছি, লোকজন দাম জিজ্ঞেস করছে। পুরোটা পথ এভাবেই দাম বলতে বলতে আসছি। হঠাৎ একটা ছাগল লাফ দিয়ে আমার উপর এসে পড়ল! তাৎক্ষণিক কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। পরে বুঝলাম, গরু দেখে হয়তো ভয় পেয়ে লাফ দিয়েছে। সেদিন আমিও কিন্তু কম ভয় পাইনি।

যাইহোক, আব্বার সঙ্গে হাটে যাওয়ার সেই আনন্দ আর কোনো দিন পাইনি। এরপর অ'সংখ্যবার গরুর হাটে গিয়েছি। দেখেশুনে গরু কিনেছি। কিন্তু সেই আনন্দ আর পাইনি। আর এখন তো হাটে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। বাসায় সারাক্ষণ বসে থাকি। আত্নীয়-স্বজন বাসায় এসে আমার সঙ্গে দেখা করে যায়। এভাবেই ঈদ কাটে।

রাহাত সাইফুল : একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। আপনি সিনিয়র অ'ভিনেতা। সবাই আপনাকে ভালোবাসে, শ্র'দ্ধা করে। চলচ্চিত্রে আপনার যথে'ষ্ট প্রভাব রয়েছে। ইতিহাসনির্ভর সিনেমা আমা'দের কম কেন?

এটিএম শামসুজ্জামান : একটাই উত্তর- বাংলায় থেকে, বাংলাদেশে থেকে শেখ মুজিবের স্বাধীনতার পতাকার নিচে থেকে আমর'া না পতাকাকে ভালোবাসতে পারলাম, না শেখ মুজিবকে ভালোবাসতে পারলাম। যদি এই দুটো জিনিসকে আমর'া মনেপ্রাণে ভালোবাসতাম তাহলে সিনেমা 'হতো। আমার তো মনে হয়, এক সময় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস মানুষ ভুলে যাবে। এতে কোনো সন্দে'হ নেই। কারণ আমি যদি কোনো জিনিস লালন না করি, চর্চা না করি তাহলে সেটি কারো মনে থাকবে না। এগু'লো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হয়। চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও কাজটি করা যায়।

রাহাত সাইফুল : আপনি নিজেও পরিচালনা করেছেন…।
এটিএম শামসুজ্জামান : আমি মাত্র একটি সিনেমা পরিচালনা করেছি। তাছাড়া সিনেমা বানাতে পয়সা লাগে। আমি এমন একজন মানুষ যাকে ঈশ্বর সব দিয়েছে, শুধু পয়সা দেয়নি। আমি এমন সিনেমা বানাতে চেয়েছিলাম যা দর্শককে উদ্দী'প্ত করবে। শেখ মুজিবকে চিত্রনাট্যে তুলে ধ’রার পরিকল্পনাও ছিল। আমার এই স্বপ্নটা এখনও আছে। কিন্তু প্রধান সংকট টাকা। জীবনের এই শেষ মুহূর্তে একটাই চাওয়া- শেখ মুজিবকে নিয়ে সিনেমা বানাতে চাই। যে সিনেমায় মুক্তিযু'দ্ধের ইতিহাস, বাংলার সংস্কৃতি সমানভাবে উঠে আসবে। যদি সুযোগটা পাই সেটা হবে অনেক আনন্দের। না পেলেও দুঃখ নাই। কারণ গরিব মানুষের অনেক শখ পূরণ হয় না।

রাহাত সাইফুল : চলচ্চিত্র এবং নাটক দুই পর্দায় আপনি কাজ করেছেন? কোন জায়গায় কাজ করতে ভালো লেগেছে?
এটিএম শামসুজ্জামান : কোনো জায়গাতেই ভালো লাগেনি। সবগু'লো ক অক্ষর গোমাংস। জীবন ধারণের জন্য পয়সা প্রয়োজন, তাই কাজ করেছি। দুদিন পরে মা'রা যাব। কিন্তু আমার কথাগু'লো থেকে যাবে। আবারও বলছি- সবগু'লো ক অক্ষর গোমাংস। পেটে বো'মা মারলেও একটা ‘ক’ শব্দ বের হবে না, এমন মানুষ যদি নাটক, সিনেমা বানায় তাহলে আমার কিছু করার নেই। তবে সে তুলনায় নাটক এগিয়ে গেছে। আমার ঘনিষ্ঠজনেরা বলতো, নাটকে আরো বেশি মনোযোগ দিতে। কিন্তু চলচ্চিত্রের কথা ভেবে আমি আগে নাটকে সময় দেইনি। আমি যদি তাদের কথা মতো নাটকে আরো আগেই চলে যেতাম, তাহলে আজ আমার এই দশা 'হতো না।

রাহাত সাইফুল : বর্তমানে যারা সিনেমা নির্মাণ করছেন তাদের সর্ম্পকে আপনার মূল্যায়ন কী?
এটিএম শামসুজ্জামান : এখন যারা সিনেমা নির্মাণ করছেন তারা একদিকে ঝুঁকে আছেন। সেটা হচ্ছে- টাকা। যে শিল্পীর অর্থের ঝোঁক চলে যাবে তাকে শিল্প থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। যে ম'দ্যপান করে তাকে হয়তো আট'কে রাখলে কিছুদিন পরে নে'শাটা কমে যায়। কিন্তু সংস্কৃতিকে যারা অন্য ধা'রায়, অন্য স্টাইলে নিয়ে যায় তাদের ফেরানো সহজ নয়। এখন সবাই এই অন্য ধা'রার নে'শায় আচ্ছন্ন। সমস্যা হলো এই ধা'রার বি'ষয়ে তাদের কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই! তারা শুধু টাকার পেছনে ছুটছে।

রাহাত সাইফুল : চলচ্চিত্রের এই বেহাল দশার কারণ কী 'হতে পারে বলে মনে করেন?
এটিএম শামসুজ্জামান : বলতে পারি, কিন্তু ওরা ক'ষ্ট পাবে। কাউকে ক'ষ্ট দেওয়ার ইচ্ছে নেই। চলচ্চিত্র বানাচ্ছেন কার জন্য? একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে- বাংলার মানুষের জন্য চলচ্চিত্র বানাচ্ছি। তাদের জীবন, তাদের সংস্কৃতি, তাদের আচার-আচরণ সব কিছু নিয়েই চলচ্চিত্র। অন্তত এটুকুও যদি তাদের মাথায় থাকে তাহলে আর কিছু না হোক একেবারে না-দেখার মতো কিছু হবে না। আমার ধারণা যারা সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলেন তারা সংস্কৃতি কী জানেন না।

রাহাত সাইফুল : আমা'দের চলচ্চিত্রে নতুন খল-অ'ভিনেতা, কমেডিয়ান তৈরি হচ্ছে না কেন? আপনার ব্যাখ্যা কী?
এটিএম শামসুজ্জামান : এর অন্যতম কারণ ভালো স্ক্রিপ্টের অভাব। আমর'া না কমেডি বুঝি, না কমেডি কীভাবে লিখতে হয় সেটা বুঝি। এখনকার স্ক্রিপ্ট রাইটাররা চে'ষ্টা করছেন না। ‘তারা পারছেন না’ বললে ক'ষ্ট পাবেন। এবার আসুন অ'ভিনেতা সম্পর্কে। অ'ভিনেতা প্রতি মুহূর্তে তার চরিত্রের সঙ্গে কথা বলবে। এভাবে সে চরিত্র আ'ত্মস্থ করবে। আমি এখনও চরিত্র ফুটিয়ে তোলার আগে নিজের সঙ্গে কথা বলি। সবসময় দেখি কোথায় কোন ভুল করলাম। কোথায় উচ্চারণ ভুল হলো। প্রতিনিয়ত ভুল করে যাচ্ছি। ভুল করতে করতেই শিখছি। অ'ভিনেতার ভুল থেকে শেখার মানসিকতা থাকতে হবে। জীবন অনেক দ্রুত গতিতে চলছে। কিন্তু এই গতি অ'ভিনেতার জন্য নয়। তার আলাদা সময় প্রয়োজন। যে সময়টুকু সে তার চরিত্রকে দেবে।

রাহাত সাইফুল : আপনি চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের স্বনামখ্যাত অ'ভিনেতা। তখন বাঘা বাঘা অ'ভিনেতা ছিলেন। সেই সময় নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা কী ছিল? মানে, আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী?
এটিএম শামসুজ্জামান : খলিল ভাই, মুস্তাফা (গো'লাম মুস্তাফা) ভাইকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে 'হতো। কারণ তারা জেনেশুনে অ'ভিনয় করতেন। আমি চে'ষ্টা করতাম, মুস্তাফা ভাইয়ের কাছে যেন হেরে যেতে না হয়। মুস্তাফা ভাই চে'ষ্টা করতেন আমাকে হারাতে। আর এখন প্রতিযোগিতা হয় টাকার। অ'ভিনয় শেষ হলেই টাকা; কে কতো টাকা পাবে সেই প্রতিযোগিতা। আমর'া এভাবে ভাবতাম না। অ'ভিনয়টাই ছিল গু'রত্বপূর্ণ। কী পাবো তার চেয়ে বড় ছিল কী করতে পারবো এটা নিয়ে।

রাহাত সাইফুল : অনেকেই খল চরিত্রে অ'ভিনয় করেছেন। কিন্তু দেশে আপনিই প্রথম খল চরিত্রের সঙ্গে কমেডি যুক্ত করেছেন।
এটিএম শামসুজ্জামান : ন'ষ্ট মানুষের চরিত্র আমি কমেডি দিয়ে করেছি। আমি অতি বাজে কথা বলবো, অতি নিষ্ঠুর কাজ করবো, যাতে মানুষ বুঝতে পারে ‘খুবই বাজে লোক’। বুঝতে পেরে তারা একটু হাসবে। তবে আমি যাদের জন্য অ'ভিনয় করি, তারা কীভাবে হাসে, কীভাবে কাঁদে এগু'লো আমার শিখতে হয়েছে। আমি অধিকাংশ সিনেমায় বদমাইশ, ইতর চরিত্রে অ'ভিনয় করেছি।

রাহাত সাইফুল : অনেক নায়কের সঙ্গে আপনি কাজ করেছেন? কার সঙ্গে কাজ করতে ভালো লেগেছে?
এটিএম শামসুজ্জামান : নিঃসন্দে'হে রাজ্জাক সাহেব। তার সংলাপ ডেলিভারি খুব ভালো ছিল। পরিষ্কার-পরিছন্ন। আমার ভালো লাগতো। সহশিল্পী যদি ভালো খেলোয়াড় না হয় তার সঙ্গে খেলা জমে না। রাজ্জাক সাহেবের সবচেয়ে বড় গু'ণ বাংলা খুব সুন্দর করে বলতেন। শুনতে ইচ্ছে করতো। ফেরদৌসকেও আমার মোটামুটি ভালো লেগেছে। তার ডেলিভারি খুব স্বাভা'বিক।

রাহাত সাইফুল : হু’মায়ূন ফরীদি?
এটিএম শামসুজ্জামান : ফরীদির মতো শিল্পী বাংলার মাটিতে আর আসবে না। আমাকে এতো শ্র'দ্ধা করতো যে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। অথচ আমার মতো একশ এটিএম সমান একটা ফরীদি। আমাকে দেখলে চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে থাকতো। অথচ আমি খুব বুঝতাম, এর সঙ্গে অ'ভিনয় করে পারা যাবে না। বাংলার মাটিতে অনেক শিল্পী আসবে ফরীদি আর আসবে না।

রাহাত সাইফুল : শুটিং করতে গিয়ে মজার কোনো ঘটনা কী মনে পড়ে?

এটিএম শামসুজ্জামান : অ'সংখ্য ঘটনা আছে। আমি গারো পাহারে শুটিং করতে গিয়েছিলাম। পরিচালক ছিলেন এ'হতেশাম। আমি জুম্মার দিনে গোসল করে পাজামা পাঞ্জাবি পরে যখন মসজিদে যাচ্ছি তখন একজন লোক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন- কোথায় যাচ্ছেন? আমি বললাম, মসজিদে যাচ্ছি। লোকটি বললো, জুম্মার নামাজ পরে আপনার লাভ কী? আমি বললাম, কেন ভাই? তিনি বললেন, জীবনে এতো আকাম করেছেন বুঝতে পারছেন না? আপনি একটা বাজে

Facebook Comments
Back to top button