বাংলাদেশ ক্রিকেটের মিতু ‘নাম্বার ওয়ান’

লর্ডসে টেস্ট ক্যাপ পাওয়ার পর কেটে গেছে দুই যুগের মতো সময়। রং চটে যাওয়া সেই পুরোনো টুপিটিই আজও মুশফিকুর রহিমের সবচেয়ে প্রিয় স্মারক। সদ্য গোঁফওঠা কিশোর থেকে মধ্যবয়সী ক্রিকেটার—৭ হাজার দিনেরও বেশি সময়ের পথচলায় তাঁর সঙ্গে ছিল এই টপিটি এবং বাংলাদেশ দলের অনন্ত সংগ্রাম। শততম টেস্টে নামার মুহূর্তে সেই পথচলার প্রতিটি কষ্ট, ব্যর্থতা ও অর্জনের সাক্ষী হয়ে উঠেছেন তিনি।
মুশফিক ‘পঞ্চপাণ্ডব’-এর যুগেও সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন না; বরং ছিলেন দায়িত্বশীল পার্শ্বচরিত্র। কখনো জনপ্রিয়তার ঢেউ কিংবা ড্রেসিংরুমের গল্প-আড্ডায় নিজেকে মিশিয়ে দেননি খুব একটা। তাঁর নামের আগে ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ তকমা এসেছে আড়ম্বরের চেয়ে বেশি শ্রদ্ধায়। দলের প্রয়োজনে তিনি লড়েছেন সামনে থেকে, নিজের সাফল্যকে সবসময় দলীয় সাফল্যের আড়ালে রেখেছেন।
তার কঠোর পরিশ্রম, ভোরে উঠে একা অনুশীলন করা, নেটে-জিমে নিরলস উপস্থিতি—সবই সবার জানা। কিন্তু জানা নেই তাঁর ভেতরের ক্ষতগুলোর কথা। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে তাঁর নেতৃত্ব থাকলেও মিডিয়ার যেটুকু স্বীকৃতি পাওয়ার কথা ছিল, তা পাননি। ড্রেসিংরুমে সবাইকে আপন করে নিতে চাইলেও অনেক সময় উপেক্ষার দেয়ালই পেয়েছেন।
কোচ হাথুরুসিংহের পছন্দের তালিকায় জায়গা না পাওয়ায় একসময় কিপিং গ্লাভস ছেড়ে ব্যাট হাতে মনোযোগ দেন তিনি। তবুও ক্রিকেট ছাড়েননি কখনো, বরং বিশ্বাস রেখেছেন একটাই বিষয়ে—অবিচল পরিশ্রম। তাঁর নীতি, বিশ্বাস এবং নিজের প্রতি কঠোরতা তাঁকে তৈরি করেছে এক স্বতন্ত্র চরিত্রে, যেখানে খুব কম মানুষই প্রবেশাধিকার পায়।
মুশফিকের ক্রিকেটজীবনে মিশে আছে কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ। ছোট চেহারা নিয়ে যেদিন লর্ডসে এক সাংবাদিক প্রশ্ন তুলেছিল, সেদিনই ১৬ বছরের কিশোরটি বলেছিল—“ক্রিকেট বয়স বা উচ্চতার খেলা নয়।” সেই দৃঢ় উত্তরই যেন আজকের ৬,৩৫১ রানের মালিক মুশফিককে আগাম বলে দিয়েছিল। যদি তিন টেস্টের বেশি সিরিজ খেলতে পারতেন নিয়মিত, তাঁর পরিসংখ্যান আরও সমৃদ্ধ হতো।
জাভেদ ওমর থেকে সাকিব, সেখান থেকে শান্ত—তিন প্রজন্মের সঙ্গী নিয়ে পথ চলেছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে খেলেছেন যারা, অনেকে আজ বিভিন্ন দায়িত্বে জাতীয় দলের কাছেই আছেন। কিন্তু মুশফিক—তিনি অনন্য এক অধ্যায়।
অতীত-বর্তমান মিলিয়ে বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে তাঁর জায়গাটি তাই একটাই—
‘মিতু নাম্বার ওয়ান’।