করোনায় মৃত্যুর খবর এলেই ছুটে যান তারা

বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী শতাধিক সংগঠন। তবে করোনাকালে মরদেহ সৎকার, দুস্থদের খাবার বিতরণসহ সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আগৈলঝাড়াবাসীর নজর কেড়েছে ‘মনোরঞ্জন ঘটক চ্যারিটি ফাউন্ডেশন’ নামে সংগঠনটি। গত ১৫ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে বা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে এমন ২৭ জনের মরদেহ সৎকার করেছেন সংগঠনটির সদস্যরা। যার মধ্যে বেশ কয়েকজনের শেষকৃত্যের জন্য পরিবার, আত্মীয় স্বজন কিংবা প্রতিবেশী কেউ এগিয়ে আসেনি। সেসব মরদেহ সৎকার করে আলোচনায় উঠে এসেছে সংগঠনটি।

শুধু আগৈলঝাড়া নয়, গোপালগঞ্জ শহর, কোটালীপাড়াসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় করোনায় কেউ মারা গেলেও ডাক পড়েছে সংগঠনটির সদস্যদের। এমনকি ঢাকায় বেশ কয়েকটি মরদেহ সৎকার করেছে এ সংগঠনের সদস্যরা। মরদেহ দাহ করতে গিয়ে নানা বাধাবিপত্তি ও প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে সংগঠনের সদস্যদের। কিন্তু পিছু হটেননি তারা। নানা বাধা-বিপত্তির মধ্যেও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন সংগঠনের সদস্যরা।

আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের বড় বাশাইল গ্রামে ‘মনোরঞ্জন ঘটক চ্যারিটি ফাউন্ডেশন’ নামে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১০ সালে। দারিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে ওই গ্রামের মলয় ঘটক নামে বিদ্যানুরাগী এক যুবকের উদ্যোগে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। গরিব ও অসহায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় অর্থ সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষা উপকরণ প্রদান করাই ছিল সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য। প্রথমে হাতে গোনা কয়েকজন সদস্য ছিলেন। ধীরে ধীরে সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। নানা উদ্যোগ দেখে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও। বর্তমানে সংগঠনের সদস্য সংখ্যা ৫১ জন।

তাছাড়া করোনাকালে মরদেহ সৎকারের জন্য সংগঠনের রয়েছে আলাদা একটি ইউনিট। গত এপ্রিলে এই ইউনিটটি গঠন করা হয়। নাম দেয়া হয় ‘সৎকার টিম’। সাবেক শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার একঝাঁক তরুণ এই সৎকার টিমের সদস্য। এ টিমের সদস্য সংখ্যা ২৫ জন। এদের মধ্যে ১০ জন্য সদস্য চাকরি বা লেখাপড়ার সুবাদে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তারা ঢাকায় মরদেহ সৎকারের কাজ করেন। বাকিরা আগৈলঝাড়ায় থাকেন। তারা আগৈলঝাড়াসহ আশপাশের উপজেলার সৎকারের কাজ করে আসছেন।

মনোরঞ্জন ঘটক চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের সৎকার টিমের সমন্বয়কারী শচীন মল্লিক জানান, করোনা সঙ্কটের শুরুর দিকে হ্যান্ডস্যানিটাইজার ও ওষুধ বিতরণসহ নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামে সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা। এরপর লকডাউনে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের মাঝে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ সময় খবর পাচ্ছিলাম করোনায় আক্রান্ত হয়ে বা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ দাফন বা সৎকারে পরিবারের সদস্যদের সীমাহীন ভোগান্তি ও দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। এমন সব ঘটনা সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মলয় ঘটকের মনে নাড়া দেয়। এরপর তিনি (মলয় ঘটক) একদিন সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠকে মলয় ঘটক মরদেহ সৎকারের কাজে সদস্যদের অংশ নেয়ার আহ্বান জানান। নৈতিক বাধ্যবাধকতা ও দায়িত্ববোধের কথা বলে সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করেন। পরে সকল সদস্যদের সম্মতিক্রমে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট সৎকার টিম গঠন করা হয়। টিম পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় মনোরঞ্জন ঘটক চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সাংগঠনিক সম্পাদক মলয় ঘটককে। এরপর মরদেহ দাহের কাজে নেমে পড়েন সৎকার টিমের সদস্যরা।

সংগঠনের ব্যয় কীভাবে নির্বাহ হয় জানতে চাইলে শচীন মল্লিক বলেন, সংগঠনের উপার্জনক্ষম সদস্যরাই নিয়মিত চাঁদা দেন। তবে ওই অর্থে সংগঠনের সকল ব্যয় নির্বাহ সম্ভব নয়। কারণ প্রতি মরদেহ সৎকারে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু অর্থাভাবে আমাদের কাজ কখনও থেমে থাকেনি। যখনই অর্থের প্রয়োজন হয়েছে মলয় ঘটক ও তার পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে এসেছেন। তাদের অনুদানেই সংগঠনের বেশিরভাগ ব্যয় নির্বাহ হচ্ছে।

মনোরঞ্জন ঘটক চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সৎকার টিমের পরিচালক মলয় ঘটক বলেন, আমাদের সংগঠনের বয়স প্রায় ১০ বছর। সংগঠনের জন্মলগ্ন থেকেই সদস্যরা সমাজসেবামূলক নানা কর্মকাণ্ড করে আসছেন। দাফন-সৎকার ছাড়াও করোনাকালে দুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ, গাছ লাগানোসহ নানান কাজে নিয়োজিত রয়েছেন সদস্যরা। এ সংগঠনের কোনো পৃষ্ঠপোষক নেই। তবে তাদের আছে হৃদয় নিংড়ানো সদিচ্ছা।

মরদেহ সৎকারে সদস্যদের এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে মলয় ঘটক বলেন, মার্চের শেষ বা এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে গণমাধ্যমে কয়েকটি খবর চোখে পড়ে। করোনায় মৃত ব্যক্তিদের সৎকারে আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশী কেউ এগিয়ে আসছে না। খবরগুলো পড়ে অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত হই। খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। ভাবতে থাকি, কীভাবে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো যায়। সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে পরিকল্পনা করি। পরিশেষে সৎকার কমিটি গঠন করা হয়।

তবে মরদেহ সৎকারের কাজে সদস্যদের যুক্ত করা সহজ ছিল না। তখন করোনা শহর থেকে গ্রামেও পৌঁছে গেছে। সবাই করোনা নিয়ে আতঙ্কে। সদস্যদের মনের মধ্যে আক্রান্তের ভয়, শঙ্কা সবকিছুই ছিল। তাছাড়া এলাকার অনেক মানুষ আমাদের এই কাজ একদম ভালো চোখে দেখেননি। তারা আড়ালে-আবডালে সমালোচনা করেছেন। সদস্যদের কারণে এলাকায় করোনা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়বে বলেছেন। আমাদের একঘরে করে রাখার কথাও বলেছেন। তবে তাতে দমে যাইনি। প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে মানবসেবায় নেমে পড়েন সদস্যরা।

মলয় ঘটক বলেন, মরদেহ সৎকার করতে গিয়ে বেশ কয়েকবার বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে সদস্যদের। গত ২৭ আগস্টের ঘটনা। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার রামশীল ইউনিয়নের খাগবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা সাবেক শিক্ষক হরেন্দ্র নাথ হালদারের মৃত্যু হয়। আমাদের কাছে খবর আসে আত্মীয়-স্বজন বা এলাকাবাসী কেউ এগিয়ে না আসায় হরেন্দ্র নাথ হালদারের মরদেহটি বাড়ির আঙিনায় পড়ে রয়েছে। এরপর আগৈলঝাড়া থেকে কোটালীপাড়ার উদ্দেশ্যে আমাদের সৎকার টিমের ৭ জন সদস্য রওনা হন। হরেন্দ্র নাথ হালদারের বাড়ির অদূরে আমাদের দলটিকে আটকে দেয়া হয়। ওই গ্রামের ২৫/২৬ জন যুবক সেদিন আমাদের পথরোধ করেছিলেন। তাদেরকে পথ ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন সদ্যরা। কিন্তু তারা লাঠিসোটা নিয়ে আমাদের ঘিরে রাখেন। বাধার কারণে সেদিন প্রায় ৪ ঘণ্টা সড়কের ওপর অবস্থান করতে হয়েছিল। পরে আমরা কোটালীপাড়া থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরে পুলিশের একটি দল এসে আমাদের হরেন্দ্র নাথ হালদারের বাড়ি পৌঁছে দেয়।

মলয় ঘটক বলেন, গত ১৫ এপ্রিল থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ২৭ জন করেনায় আক্রান্ত বা করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া মৃতদেহের সৎকার করেছে টিমের সদস্যরা। এই ২৭ জনের মধ্যে পরিবারের কোনো সদস্য না আসায় অন্তত ৫ জনের মুখাগ্নি করেছেন সংগঠনের সদস্যরা।

মলয় ঘটক বলেন, যত দিন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হবে, ততদিন সৎকার কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। আমাদের সদস্যরা জেনেশুনে মারাত্মক ভাইরাসের সবচেয়ে কাছে যাচ্ছেন। ঝুঁকি জেনেও তারা পিছু হটেননি। শুধু দোয়া করবেন, আমরা যেন সুস্থ থাকি এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানব সেবায় কাজ করে যেতে পারি।

আগৈলঝাড়া উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা সুশান্ত বালা জানান, করোনাকালে দুর্যোগ পীড়িত মানুষের পাশে থেকে মনোরঞ্জন ঘটক চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের সৎকার টিমের সদস্যরা মানবিকতার নানা উদাহরণ গড়ে তুলছেন। শুনেছি মরদেহ দাহ করতে গিয়ে তাদের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে। তবে তারা বাধার মুখে পড়েও পিছু হটেননি। তাদের সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।

আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) চৌধুরী রওশন ইসলাম জানান, করোনায় বিপন্ন মানুষকে সাহায্যে কাজ করে যাচ্ছেন মনোরঞ্জন ঘটক চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের সদস্যরা। করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে অনেকেই যখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তখন তারা গিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। নিঃসন্দেহে তাদের এসব কাজ প্রসংশাযোগ্য।

jagonews24