ভোগান্তির অন্ত নেই সউদীগামী যাত্রীর

হোটেলে রাত্রি যাপনের টাকাও শেষ। বাড়ী থেকে বিকাশে টাকা এনে রুটি-কলা খেয়ে পাঁচ দিন কাটিয়েছি ঢাকার ফুটপাতে। আমাদের ভিসা ও ইকামার মেয়াদও ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হয়ে যাবে। আমাদের কথা শোনার কেউ নেই। বিদেশে চাকরি করে কী আমরা অপরাধ করছি ? সউদীগামী বিমানের যাত্রী জামালপুরের মো. সুজন,রফিকুল ইসলাম ও বরিশালের মো.সানু গতকাল শনিবার মতিঝিলস্থ বিমানের অফিসের সামনে এসব কথা বলেন। শুক্রবার দিবাগত রাত ২ টায় বিমান অফিসের সামনে লাইন ধরেও দাম্মামগামী যাত্রী কুমিল্লার জয়নালকে ভেতরে ঢুকতে দেয়া হয়নি। সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে সে নিরাশ মনে এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন।

সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের টিকিটের জন্য গতকাল শনিবারও সোনারগাঁও হোটেলের বাইরে বিক্ষোভ করছেন সউদী প্রবাসী কর্মীরা। টোকেন পদ্ধতি বাদ দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকিট রিকনফার্ম করার জন্য তাদের এই বিক্ষোভ। করোনা মহামারির আগে ছুটিতে দেশে আসা সউদী গমনেচ্ছুরা গতকাল শনিবার ভোর থেকে সাউদিয়া কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। সাউদিয়ার যাত্রী মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের ফয়সাল ও শ্রীনগরের শাহীন গত দু’দিন যাবত ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অফিসের ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। তারা বলেন, সাউদিয়ার এ কেমন নীতি হাজার হাজার যাত্রীরা ফিরতি টিকিট রিকনফার্ম করতে এসে রাস্তায় বৃষ্টিতে ভিজছে। তারা কোনো সঠিক ঘোষণা দিচ্ছে না আমরা কবে নাগাদ ফিরতি টিকিট রিকনফার্ম করতে পারবো।

সাউদিয়ার অফিসে ঢুকতে না পেরে সকাল পৌনে ১১ টার দিকে এসব যাত্রীরা কাওরায়ান বাজার সড়ক অবরোধ করেন। এ সময়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে আসে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মাইকিং করে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা শান্তিপূর্ণভাবে থাকুন। সড়ক ছেড়ে দিন। এছাড়া খেয়াল রাখবেন আপনাদের এই ভিড়ের মধ্যে টিকিট প্রত্যাশী ছাড়া অন্য কেউ যাতে ঢুকতে না পারে। সাউদিয়ার এক কর্মকর্তা ঘোষণা দেন গতকাল শনিবার টোকেন নম্বর ৮৫১ থেকে ১২০০ এবং আজ রোববার ১২০১ থেকে এক হাজার ৫০০ পর্যন্ত টোকেনধারীদের টিকিট দেয়া হবে। তবে আজ অতিরিক্ত ২০০ জনকে টিকিট দেয়া হতে পারে। যারা টোকেন পাননি তারা আগামী ৪ অক্টোবর আসবেন।

বিক্ষুদ্ধ প্রবাসীরা বলেন, আমরা যারা সউদী থেকে দেশে ফেরার সময় রিটার্ন টিকিট নিয়ে ফিরেছিলাম তাদের কোনো অগ্রাধিকার না দিয়েই গণহারে টোকেন দিয়ে যাচ্ছে সাউদিয়া। যার টাকা আছে, সে আগে টোকেন পাচ্ছে। অথচ যারা সউদী যাওয়ার টিকিট কেটে বাংলাদেশে এসেছিল তাদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তাহলে আগাম টিকিট কেটে লাভ কি হলো?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সউদী প্রবাসী বলেন, গত ১৬ মার্চ সউদী ফেরার টিকিট ছিল আমার। ফ্লাইট চালুর সংবাদ শুনে আমরা এখানে এসেছিলাম টিকিটের নতুন তারিখ জানতে। এখানে এসে দেখি আমাকে ২ হাজারের পরে সিরিয়াল দেয়া হয়েছে। তারা টোকেন এর ভিত্তিতে আগে আসলে আগে সিরিয়াল পাবেন। এমনভাবে টিকিট রিকনফার্ম শুরু করছে। যাদের সউদী যাওয়ার তারিখ জুলাই-আগস্ট মাসে তারাও আমাদের আগের সিরিয়াল পেয়েছেন। অথচ আমরা মার্চের যাত্রী হয়েও টিকিট পাচ্ছি না। সাউদিয়া অসাধু কর্মকর্তারা ফিরতি টিকিট নিয়ে বাণিজ্য করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। এজন্যই আমাদের বিক্ষোভ।

এদিকে, বিমান অফিসের সামনে গতকালও অপেক্ষমান শত শত যাত্রী টিকিটের দাবিতে হট্টেগোল করেন। বিমানের দাম্মামগামী যাত্রী মুন্সিগঞ্জের লৌহজং এর আলম মুন্সি, বি-বাড়িয়ার আমির হোসেন, কুমিল্লার মো. মোজাম্মেল ভূঁইয়া ও জামালপুরের রফিকুল ইসলাম ও বিল্লাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ভিসা ও ইকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্ত আজ ৪ / ৫ দিন যাবত বিমান অফিসের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েও কোন টিকিট পাচ্ছি না। সউদীর দাম্মামগামী বিমানের কোন ফ্লাইট নেই বলে আমাদের তাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তারা বলেন, দাম্মামের ফ্লাইট কবে নাগাদ চালু করা হবে কর্মকর্তারা তা’সঠিক করে বলছে না। এভাবে সউদীর দাম্মামগামী আড়াই হাজার যাত্রীর ভোগান্তির অন্ত নেই। বিমানের ঢাকা সেলস ম্যানেজার শামসুল করিমের সাথে একাধিকবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

বিমান জানিয়েছে, তারিখ অনুসারে যাত্রীদের ফিরতি টিকিট রি-ইস্যু করা হচ্ছে। করোনাভাইরাসের কারণে ১৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সউদী আরবের আকাশপথের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে ১৬ মার্চ থেকে বিমানের পরবর্তী সব শিডিউল ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। টিকিট বিতরণের ক্ষেত্রে বিমান ফ্লাইট বাতিলের তারিখ ধরে পর্যায়ক্রমে বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর টিকিট রি-ইস্যু করছে।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোকাব্বির হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যাত্রীদের সুশৃঙ্খলভাবে টিকিট দিতে আমরা ফ্লাইট বাতিলের তারিখ ধরে টিকিট রি-ইস্যু করবো। প্রথমে ১৬ মার্চে বাতিল হওয়া ফ্লাইটের টিকিট রি-ইস্যু করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ১৭, ১৮, ১৯, ২০ মার্চ এভাবে তারিখ ধরে ধরে সিরিয়ালি টিকিট রি-ইস্যু করা হবে। বর্তমানে রিয়াদ ও জেদ্দায় ফ্লাইটের অনুমতি পেয়েছে বিমান। অনুমতি না পাওয়ায় দাম্মাম ও মদিনার রুটের যাত্রীদের এখনই টিকিট রি-ইস্যু করেছে না এয়ারলাইন্সটি। বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন বলেন, আমরা রিয়াদ ও জেদ্দায় ফ্লাইটের অনুমতি পেয়েছি। দাম্মাম ও মদিনার রুটে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমোদন পেলে সেই রুটগুলোতেও ফ্লাইট চলবে। নতুন ফ্লাইট অনুমোদন সাপেক্ষে পর্যায়ক্রমে অন্য যাত্রীদেরও বুকিংয়ের কাজ শুরু করা হবে।

গতকাল ঢাকা-জেদ্দা ও আজ রোববার ঢাকা-রিয়াদে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। এই দুই ফ্লাইটে ১৬ ও ১৭ মার্চের জেদ্দা ও রিয়াদের বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীদের টিকিট রি-ইস্যু করা হয়েছে। তাদের জন্য ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে টিকিট ইস্যুর কার্যক্রম শুরু করে বিমান। ২৯ সেপ্টেম্বর বিমান ঢাকা-রিয়াদ ও ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা-জেদ্দা যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করবে। এদিকে,সউদীগামী যাত্রীরা করোনাভাইরাস নমুনা পরীক্ষা দিয়েও যথাসময়ে রিপোর্ট পাচ্ছে না। করোনা নেগেটিভ রিপোর্টসহ বিমানবন্দরে চার ঘন্টা আগে পৌঁছতে না পারলে টিকিট পেয়েও সউদী যাওয়া সম্ভব হবে না যাত্রীদের।

এদিকে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে করোনা পরীক্ষার সনদ নিয়ে আসায় ৩২ জনকে বোর্ডিং কার্ড দেয়নি সউদী অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাদের রেখেই ছেড়ে যায় এসভি ৩৮০৭ ফ্লাইট। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। কেরাণীগঞ্জের প্রবাসী নূর ইসলামের করোনা টেস্ট ধানমন্ডি ইবনে সিনা হাসপাতালে করা হয়েছে। সেই নেগেটিভ সনদ নিয়ে বিমানবন্দরে গেলে বোর্ডিং কার্ড দেয়নি।

প্রবাসী শাহজাহানের স্বজনরা জানিয়েছেন, এনাম মেডিক্যাল সেন্টার থেকে করোনা পরীক্ষা করান শাহজাহান। তাকেও বোর্ডিং কার্ড দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে সউদী অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের কোনও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে এ যাত্রীদের অন্য ফ্লাইটে যাওয়ার ব্যবস্থা হবে কিনা তাও জানানো হয়নি। এদিকে ৩২ জন বিমানবন্দরের ভেতরেই আছেন। প্রবাসীদের জন্য সরকার মহাখালীতে ডিএনসিসি করোনা স্যাম্পল কালেকশন বুথ চালু করে। এয়ারলাইন্সগুলো জানিয়েছিল, সউদীগামী যাত্রীদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে করোনা নেগেটিভ রিপোর্টসহ বিমানবন্দরে আসতে হবে। করোনা টেস্টের জন্য সরকার নির্ধারিত স্থান থেকে করোনাটেস্টের কথাও বলা হয়।

dailyinqilab